শতবর্ষে মহাশ্বেতা দেবী – প্রবন্ধ রচনা | Mahasweta Devi Prabandha Rachana Class 12

মহাশ্বেতা দেবী প্রবন্ধ রচনা (Mahasweta Devi Prabandha Rachana), মহাশ্বেতা দেবী এর জীবনী (Mahasweta Devi Biography in Bengali) , শতবর্ষে মহাশ্বেতা দেবী, মহাশ্বেতা দেবী উচ্চ মাধ্যমিক 2026 রচনা (HS 2026), উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা রচনা, উচ্চ-মাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রচনা, মহাশ্বেতা দেবী প্রবন্ধ রচনা Class 12

শতবর্ষে মহাশ্বেতা দেবী  – প্রবন্ধ রচনা (Mahasweta Devi Prabandha Rachana Class 12)

প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে একটি প্রবন্ধ রচনা করো : 

মহাশ্বেতা দেবী

জন্ম: ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি।

পিতা: মণীশ ঘটক।

মাতা: ধরিত্রী দেবী।

শিক্ষাজীবন: প্রাথমিক শিক্ষা মায়ের কাছে। তারপর ঢাকার ইডেন স্কুল। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনে ভরতি হন। সেখান থেকে কলকাতার বেলতলা বালিকা বিদ্যালয়। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আশুতোষ কলেজ। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতন কলেজ থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে সাম্মানিক স্নাতক। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ।

কর্মজীবন: পদ্মপুকুর বালিকা বিদ্যালয়ে প্রাতঃকালীন বিভাগে শিক্ষকতা। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে রমেশচন্দ্র মিত্র বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে বিজয়গড় কলেজে ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক রূপে যোগদান। ১৯৮৪-তে সেখান থেকেই স্বেচ্ছাবসর।

সাহিত্যকীর্তি: ‘রংমশাল’ পত্রিকায় প্রথম লেখা প্রকাশিত। প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ ‘ঝাঁসির রানী’ (১৯৫৬)। তারপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘নটী’, ‘কি বসন্তে কি শরতে’, ‘হাজার চুরাশীর মা’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘তিতুমির’, ‘নীলছবি’, ‘সাত নম্বর আত্মহত্যা’, ‘স্তন্যদায়িনী ও অন্যান্য গল্প’, ‘রুদালী’, ‘হারুন সালেমের মাসি’, ‘বিরসা মুণ্ডা’, ‘ভারতের লোককথা’ প্রভৃতি।

প্রাপ্ত সম্মান : ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ‘শিশিরকুমার ও মতিলাল পুরস্কার’, ‘শরৎচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার’, ‘আকাদেমি পুরস্কার’, ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য স্বর্ণপদক’, ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ‘পদ্মশ্রী’, ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ‘ম্যাগসাসাই’, ১৯৯৯-এ বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রদত্ত ‘দেশিকোত্তম’। এ ছাড়াও পেয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট. সম্মান।

মৃত্যু: ২৬ জুলাই ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ।

শতবর্ষে মহাশ্বেতা

ভূমিকা

ব্রাত্য জীবনের সফল সংগ্রামী কথাকার ‘হাজার চরাশীর মা’ মহাশ্বেতা দেবী মহিলা কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী। চিরবঞ্চিত, অবহেলিত মানুষদের নিয়েই তাঁর সাহিত্যসাধনা। শিল্প ও বাস্তবের মেলবন্ধন এমনভাবে সার্থক হয়ে উঠতে আর কারও রচিত সাহিত্যে লক্ষ করা যায় না। একজন অসাধারণ সমাজকর্মী মহাশ্বেতার রচনায় আমরা খুঁজে পাই চিরকালীন জীবন স্পন্দন ও সময়ের জীবন্ত ছবি।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলায় মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল পাবনা জেলার ‘ভাড়েঙ্গা গ্রাম’। পরবর্তীকালে তাঁরা সপরিবারে রাজশাহি শহরে স্থানান্তরিত হন। তাঁর পিতা ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক মণীশ ঘটক। যিনি ‘যুবনাশ্ব’ ছদ্মনামে অসংখ্য গল্প রচনা করেন। তাঁর মায়ের নাম ধরিত্রী দেবী। তাঁর খুল্লতাত ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সর্বজনবিদিত পরিচালক ঋত্বিক ঘটক। নয় ভাইবোনের মধ্যে মহাশ্বেতা ছিলেন সর্বজ্যেষ্ঠা।

শিক্ষাজীবন

মহাশ্বেতার শিক্ষাজীবন শুরু হয় মায়ের কাছে। ঢাকার ইডেন স্কুলে মন্টেসরি বিভাগে অল্প কিছুদিন পড়াশোনা করার পর তিনি মেদিনীপুর মিশন স্কুলে ভরতি হন। সেখান থেকে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে ভরতি করা হয় শান্তিনিকেতনে। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর তাঁকে কলকাতার বেলতলা বালিকা বিদ্যালয়ে { ভরতি করা হয়। সেখান থেকেই তিনি ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করেন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে আশুতোষ কলেজ থেকে আই এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শান্তিনিকেতন কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে সাম্মানিক স্নাতক বিভাগে ভরতি হন। স্নাতক হওয়ার পর দীর্ঘ সতেরো বছর পর ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন

স্নাতক হওয়ার পর তিনি পদ্মপুকুর বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাতঃকালীন বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৫৭খ্রিস্টাব্দে তিনি রমেশচন্দ্র মিত্র বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। এক বছরের কিছু বেশি সময় তিনি সেখানে অতিবাহিত করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অপরাধে তাঁকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত হতে হয়। জীবন নির্বাহের জন্য প্রাইভেট টিউশন ও কাপড় কাচার সাবানও বিক্রি করতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিজয়গড় জ্যোতিষরায় কলেজে ইংরেজির অধ্যাপকরূপে নিযুক্ত হন। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকেই স্বেচ্ছাবসর নিয়ে মানব সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

সাহিত্য কীর্তি

সাহিত্য সৃষ্টির প্রতি তাঁর উন্মাদনা তাঁকে প্রাথমিকভাবে চাকুরি ছাড়তে উৎসাহিত করে। তিনি যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সেই সময় তাঁর লেখা ‘রংমশাল’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ ‘ঝাঁসির রানী’ ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ‘নটী’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘কি বসন্তে কিশরতে’ ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত বিখ্যাত উপন্যাস গুলি হল- ‘হাজার চুরাশীর মা’ (১৯৭৪), ‘অরণ্যের অধিকার’ (১৯৭৭), ‘তিতুমির’ (১৯৮৪), ‘নীলছবি’ (১৯৮৬), ‘সাত নম্বর আত্মহত্যা’ (১৯৯৪), ‘ব্যাধ খণ্ড’ (১৯৯৪), ‘যে যুদ্ধ থামল না’ (১৯৯৮) প্রভৃতি। তাঁর জনপ্রিয় গল্পগ্রন্থগুলি হল-‘সপ্তপর্ণী’ (১৯৬০), ‘স্তন্যদায়িনী ও অন্যান্য গল্প’ (১৯৭৯), ‘রুদালী’ (১৯৯৩) প্রভৃতি। তাঁর বহুপঠিত জনপ্রিয় গল্পগুলি হল-‘হারুন সালেমের মাসি’, শ্রীশ্রী গণেশ মহিমা’, ‘মোহনপুরের রূপকথা’, ‘বিরসা মুন্ডা’, ‘সত্যি রাজার গল্প’ প্রভৃতি। ‘ভারতের লোককথা’ তাঁর অনূদিত জনপ্রিয় গ্রন্থ।

প্রাপ্ত সম্মান ও পুরস্কার

সাহিত্যে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তিনি ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে শিশিরকুমার ও মতিলাল পুরস্কার লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান শরৎচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার। সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী ও ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে জ্ঞানপীঠ পুরস্কারে সম্মানিত করেন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ম্যাগসাসাই পুরস্কার লাভকরেন। বিশ্বভারতী তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করেন ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে। এ ছাড়া ভারতবর্ষের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি-লিট উপাধি প্রদান করে সম্মানিত করেন।

মৃত্যু

২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই এই মানবদরদি মহান সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। সাহিত্য স্রষ্টার চেয়েও একজন মানবতাবাদী মানুষ ও সমাজসেবী হিসেবে তিনি চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে স্থান অধিকার করে থাকবেন। বিশেষ করে আদিবাসী ও শবর সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর আন্দোলন ও প্রতিবাদ ইতিহাসে প্রোজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *