সমরেশ বসু প্রবন্ধ রচনা (Samaresh Basu Prabandha Rachana), সমরেশ বসু এর জীবনী (Samaresh Basu Biography in Bengali) , শতবর্ষের আলোকে সমরেশ বসু, সমরেশ বসু উচ্চ মাধ্যমিক 2026 রচনা (HS 2026), উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা রচনা, উচ্চ-মাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রচনা, সমরেশ বসু প্রবন্ধ রচনা Class 12
শতবর্ষে সমরেশ বসু – প্রবন্ধ রচনা (Samaresh Basu Prabandha Rachana Class 12)
প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে একটি প্রবন্ধ রচনা করো :
সমরেশ বসু
জন্ম: ১৯২৪ সাল, ১১ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের বিক্রমপুর।
পিতা: মোহিনীমোহন বসু।
মাতা: শৈবলিনী বসু।
কর্মজীবন: ডিম, সবজি বিক্রেতা; ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির কর্মী তারপর পুরোপুরিভাবে লেখকজীবনের সূত্রপাত।
রাজনৈতিক জীবন: ট্রেড ইউনিয়ন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য, ১৯৪৯-৫০ সালে কারাবরণ।
বিখ্যাত উপন্যাস: ‘গঙ্গা’, ‘বাঘিনী’, ‘বিবর’, ‘জগদ্দল’, ‘প্রজাপতি’, ‘স্বীকারোক্তি’ প্রভৃতি।
বিখ্যাত ছোটোগল্প: ‘আদাব’, ‘ছেঁড়া তমসুক’, ‘আলোয় ফেরা’, ‘অন্ধকারের গান’, ‘উজান’ ইত্যাদি।
ছদ্মনাম: ‘কালকূট’ ছদ্মনামে লেখকের কিছু সাহিত্যকর্ম হল ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’, ‘কোথায় পাব তারে’, ‘বাণীধ্বনি বেণুবনে’, নির্জন সৈকতে’, ‘শাম্ব’ প্রভৃতি। ‘ভ্রমর’ ছদ্মনামে লেখকের কিছু সাহিত্যকর্ম হল ‘আত্মজ’, ‘শেষ অধ্যায়’, ‘অন্তিম প্রণয়’, ‘যুদ্ধের শেষ সেনাপতি’ ইত্যাদি।
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: ‘শ্রীমতি কাফে’ উপন্যাসের জন্য আনন্দ পুরস্কার, ‘শাম্ব’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, ‘দেখি নাই ফিরে’ উপন্যাসের জন্য মরণোত্তর আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্তি।
মৃত্যু: ১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ।
শতবর্ষের সমরেশ
জন্ম ও বংশ পরিচয়
দিনটা ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর। বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরের মোহিনীমোহন বসু এবং শৈবলিনী দেবীর ঘরে জন্ম নিল ফুটফুটে পুত্রসন্তান, পারিবারিক সূত্রে তার নাম রাখা হল সুরথনাথ।
কর্মজীবন ও কালকূট হয়ে ওঠার কাহিনী
কিন্তু কে জানতো, বড়ো হয়ে এই ছেলেই সমস্ত পারিবারিক টানকে অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে পড়বে প্রকৃতি এবং বিচিত্র মানুষের সঙ্গ পেতে। মানবসভ্যতার গরলকে নিজের কলমে ধারণ করে কখনও সে হয়ে উঠবে ‘কালকূট’ কখনও আবার সম্পর্কের মধুসন্ধানী ‘ভ্রমর’ যে প্রয়োজনে ব্যঙ্গের হুল ফুটাতেও দ্বিধা করে না। নিজের লেখনীর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের দিক পরিবর্তনের অন্যতম কান্ডারি সুরথনাথ নিজের নামেও এনেছিলেন বদল। লেখক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নায়কের নাম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি, পরবর্তীকালে লেখক ও পাঠক-মহলে সমাদৃত হয়েছিলেন সমরেশ বসু নামে।
বাউন্ডুলে জীবন
তবে সুরথনাথ থেকে প্রখ্যাত কথাকার সমরেশ বসু হয়ে ওঠার যাত্রাপথটা মোটেই সুখকর ছিল না। পুড়াশুনায় অমনোযোগের কারণে ১৯৩৮ সালে প্রিয় বুড়িগঙ্গার তীর, শ্মশানঘাট, বন্ধুবান্ধব ছেড়ে তাকে চলে আসতে হল দাদার কাছে- ২৪ পরগণার নৈহাটিতে। পড়াশুনায় উৎসাহ না থাকলেও বাঁশি বাজানো, ছবি আঁকা, অভিনয়ে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। আপাদমস্তক প্রেমিকসত্তার অধিকারী সমরেশ নবম শ্রেণিতেই স্কুল চৌহদ্দি ছেড়ে প্রকৃতির পাঠশালার দ্বারস্থ হলেন, বন্ধুরা যখন দশম শ্রেণির পড়া নিয়ে ব্যস্ত তখন সমরেশ স্বামীবিচ্ছিন্না গৌরীদেবীকে নিয়ে নৈহাটি ছেড়ে আতপুরের এক বস্তিতে গিয়ে উঠলেন, পেটের দায়ে সবজি, ডিম বিক্রি এবং স্ত্রী গৌরীদেবীর সংগীতচর্চার মাধ্যমে জোগাড় হতে লাগল সংসার খরচ।
রাজনীতিতে প্রবেশ
এমতাবস্থায় জগদ্দল অঞ্চলের শ্রমিক নেতা সত্যপ্রসন্ন দাশগুপ্ত তাঁকে পোস্টার লেখার দায়িত্ব দেন এবং ইছাপুর বন্দুক কারখানাতে সমরেশের একটি চাকরিও জুটে যায়। ততদিনে তাঁর মার্কসবাদী মতাদর্শে হাতে খড়ি হয়েছে, সংসারে এসেছে সন্তান, বস্তি থেকে উত্তরণ ঘটেছে কারখানার শ্রমিকদের পাড়ায়। সমরেশ তখন স্বপ্ন দেখছেন শোষণহীন সমাজব্যবস্থার। তবে রাজনীতিতে অতিসক্রিয়তার দরুন তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।
সাহিত্য সেবায় সমরেশ
প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি অবস্থায় তিনি লিখতে শুরু করেন ‘উত্তরঙ্গ’। মোটামুটি ১৯৫১ সালের কাছাকাছি সময়ে জেল থেকে মুক্তি পান, চাকরি থেকে বরখাস্ত হন, কমিউনিস্ট পার্টির পাঁচ বছরের সদস্যপদ ‘ত্যাগ করেন এবং সর্বোপরি পূর্ণ সময়ের জন্য লেখালেখিকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নেন যে জীবন ছিল সম্পূর্ণভাবে অনিশ্চিত। তবে সংগঠনকে ছাড়লেও সংগ্রামী মানসিকতাকে তিনি আজীবন সঙ্গে রেখেছেন। তার প্রমাণ ‘জগদ্দল’, ‘গঙ্গা’, ‘শিকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে’, ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’, ‘বি টি রোডের ধারে’ (রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু সত্যপ্রসন্ন দাশগুপ্ত ওরফে ‘সত্য মাস্টার’-কে উৎসর্গ করে) প্রভৃতি উপন্যাস। এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি রচনা করলেন ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’-র মতো তথাকথিত অশালীন, বিতর্কিত উপন্যাসও যা মানবমনের অবদমিত যৌনচেতনাকে ব্যক্ত করেছিল; ভাষা এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে পরীক্ষামূলক এই উপন্যাসদ্বয় একাধারে নিন্দিত এবং নন্দিতও বটে। তাঁর পাশে সেই সময় সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু-সহ অনেকেই ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত ছোটোগল্পের সংখ্যা প্রায় ২০০- তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোচিত হল তাঁর রচিত প্রথম ছোটোগল্প ‘আদাব’। এ ছাড়াও ‘মরশুমের একদিন’, ‘ছেঁড়া তমসুক’, ‘জোয়ার ভাটা’, ‘আলোয় ফেরা’, ‘উজান’ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পসংকলন। ‘কালকূট’ ছদ্মনামে ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’, – ‘কোথায় পাব তারে’, ‘বাণীধ্বনি বেণুবনে’, ‘নির্জন সৈকতে’, ‘স্বর্ণশিখর { প্রাঙ্গণে’ প্রভৃতি ভ্রমণমূলক এবং বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। পিছিয়ে পড়া মানুষের সংগ্রামের কথাকে পৌরাণিক আবহে প্রকাশ করেছেন কালজয়ী উপন্যাস ‘শাম্ব’-তে।
এ ছাড়াও ‘ভ্রমর’ ছদ্মনামে সমরেশ ‘যুদ্ধের শেষ সেনাপতি’, ‘প্রভু, কার হাতে তোমার রক্ত’, ‘প্রেম কাব্য রক্ত’ ইত্যাদি রচনায় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন।
ছোটোদের সমরেশ
সমরেশ কেবল পরিণত পাঠকদের কথাই ভাবেননি, ছোটদের জন্যও তিনি সৃষ্টি করেছিলেন ‘গোয়েন্দা গোগোল’ চরিত্র যা কিশোর সাহিত্যে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। কেবল পুস্তকের গণ্ডিতে সমরেশের সাহিত্যপ্রতিভা সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি, তা জনপ্রিয়তা পেয়েছে রূপোলি পর্দাতেও। তাঁর ছোটোগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে বাংলা, হিন্দি-সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় চলচ্চিত্র, স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি নির্মিত হয়েছে। রাজেন তরফদার থেকে গুলজার পর্যন্ত বহু পরিচালক, চিত্রনাট্যকাররা তাঁর সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং সেগুলি নানা বিভাগে পুরস্কৃতও হয়েছে। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ-কে নিয়ে ‘দেখি নাই ফিরে’ উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করেছিলেন যার কয়েকটি পর্ব ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
সম্মাননা ও মৃত্যু
তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘শাম্ব’- এর জন্য তিনি ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার পেয়েছেন । ১৯৯৩ সালে এই অসমাপ্ত উপন্যাসের জন্য তিনি মরণোত্তর ‘আনন্দ পুরস্কার’ লাভ করেন।
তাঁর মৃত্যুর পর কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ে লিখেছিলেন
‘রাজকীয় মর্জি ছিলো চরিত্রে তোমার’।
১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ সমরেশের মৃত্যুতে সত্যিই বাংলা সাহিত্যজগতে ইন্দ্রপতন ঘটেছিল।
শতবর্ষে সমরেশ ও প্রাসঙ্গিকতা
তবে মেহনতি মানুষের শ্রমে আজও অমর তিনি, জন্মের একশো বছর পরেও বাঙালি তথা ভারতীয়ের আত্ম অনুসন্ধানের পথে পাথেয় হয়ে রয়েছে ‘কালকূট’-এর লেখা। শিশু-কিশোরদের রহস্যময়তার জগতে আজও তাদের সঙ্গী ‘গোয়েন্দা গোগোল’। তাঁর জন্মশতবর্ষেও তাঁর সাহিত্যসম্ভার একই রকম প্রাসঙ্গিক এবং কালোত্তীর্ণ সে কথা বলাই বাহুল্য।

