ঋত্বিক ঘটক প্রবন্ধ রচনা (Ritwik Ghatak rochona in bengali), ঋত্বিক ঘটক এর জীবনী (Ritwik Ghatak Biography in Bengali) , শতবর্ষের আলোকে ঋত্বিক ঘটক, ঋত্বিক ঘটক উচ্চ মাধ্যমিক 2025 রচনা (HS 2026), উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা রচনা, উচ্চ-মাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রচনা, ঋত্বিক ঘটক প্রবন্ধ রচনা Class 12
শতবর্ষে ঋত্বিক ঘটক – প্রবন্ধ রচনা (Ritwik Ghatak rochona in bengali)
প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে একটি প্রবন্ধ রচনা করো :
ঋত্বিক ঘটক
জন্ম : ৪ নভেম্বর ১৯২৫, ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গ বর্তমানে বাংলাদেশের মিয়াঁপাড়ায় জন্ম।
ভারতে আগমন : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ভারতে আগমন।
গণনাট্য সংঘে যোগদান : ১৯৫১ সালে।
চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ : ১৯৫১ সালে নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ ছবিতে সহকারী পরিচালকের ভূমিকায় কাজ করেন।
প্রথম ছবি: ‘নাগরিক’। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায়।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবি : ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮), ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯), ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১), ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬৫), ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) ইত্যাদি।
উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র ও আর্টফিল্ম: ‘দ্য লাইফ অফ দি আদিবাসিজ’, ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান’, ‘আমার লেনিন’।
পুরস্কারপ্রাপ্তি ও সম্মাননা: পদ্মশ্রী পুরস্কার পান ১৯৭০ সালে। শ্রেষ্ঠ কাহিনি রচয়িতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হন ১৯৭৪ সালে। সেরা পরিচালক হিসেবে ‘বাচসাস পুরস্কার’ পান।
মৃত্যু : ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬।
ঋত্বিক ঘটক প্রবন্ধ রচনা Class 12
জন্ম ও বংশ পরিচয়
‘আর্ট মানে আমার কাছে যুদ্ধ।’
বলা মানুষটি কি প্রবল দায়িত্ব নিয়ে পর্দায় স্পর্ধা দেখিয়েছেন ঋত্বিক। ঋত্বিক ঘটকের ছবি মানেই রূপক। কখনও বেদনার, কখনও বিচ্ছিন্নতার দুঃখ। দুই বাংলার ভাগ হওয়াকে যেন গোটা জীবনই যিনি মেনে নিতে পারেননি তিনি ১৯২৫ সালের চৌঠা নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার ঢাকা রাজশাহীর মিয়াঁ পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।
মাতা ইন্দুবালা ও পিতা সুরেন্দ্রচন্দ্র ঘটকের ১১ তম এবং কনিষ্ঠতম সন্তান ঋত্বিক। দাদা মণীশ ঘটকের কাছে কলকাতায় কিছুদিন পড়াশোনা করলেও ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই. এ. পাস করেন। এরপর ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর বহু শরণার্থীর সঙ্গে পা মিলিয়ে নিজ পরিবারকে সঙ্গী করে তাঁর কলকাতায় চলে আসা। বলাবাহুল্য, সেই উদ্বাস্তুদের অস্তিত্বসংকট তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল – যা পরবর্তীতে তাঁর চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।
নাটকে হাতেখড়ি
১৯৪৭ সালের ঋত্বিক ঘটক অভিধারা নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করেন এবং তাতে তাঁর প্রথম গল্প অয়নান্ত প্রকাশিত হয়। যেখানে তিনি খুব শৈল্পিকভাবে রাজশাহী কলেজ ও পদ্মা পাড়ের বর্ণনা করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে প্রথম নাটক কালো সায়ার লেখেন। ১৯৫১ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগদানের মাধ্যমে নাট্যরচনা, নাট্যপরিচালনা এবং নাট্যাভিনয় শিল্পে তার দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। ঋত্বিক ঘটকের চোখে ছিল মঞ্চ ও নাটকের স্বপ্ন। তিনি কেবল নাটককেই তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের প্রচার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
‘‘সিনেমা বানিয়ে যদি জনগণের কথা না বলতে পারতাম, তাদের কাছে না যেতে পারতাম তাহলে কবেই সিনেমার পোঁদে লাত মেরে চলে যেতাম…!’’
সিনেমা ওয়ালা
সিনেমা নিয়ে আর কে অমন বলতে পেরেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্র পরিচালক, থিয়েটার ও নাট্যব্যক্তিত্ব, চিত্রনাট্যরচয়িতা এবং শর্টফিল্ম ও তথ্যচিত্রকার। পরিচালক হিসেবে নিজনীতি ও বিশ্বাসের প্রতি ছিলেন অপসহীন। যে মানুষটি ১৯৫১ সালে নিমাই ঘোষ পরিচালিত ‘ছিন্নমূল’ – সিনেমায় এক সাধারণ অভিনেতা ও সহকারী পরিচালক হিসেবে হাতে খড়ি; এর দু’বছর পরে তার একক পরিচালনায় মুক্তি পায় প্রথম সিনেমা ‘নাগরিক’। এটি ভারতীয় আর্ট ফিল্মের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র যা পরবর্তী সময়ে বাংলা এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের নতুন ধারা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ‘অযান্ত্রিক’ – তাঁর দ্বিতীয় কিন্তু প্রথম প্রদর্শিত ছবি। যন্ত্রের সাথে মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠেছে। চিত্র সমালোচকদের মতে এটি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ছায়াছবি। ষাটের দশকে ঋত্বিক ঘটক পর পর তিনটি ছবি বানান ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২) এই সিনেমাগুলিতে ঋত্বিক ঘটক দেশভাগের পরবর্তী বাস্তবতাকে তার নিজস্ব শৈল্পিক ভাষায় উপস্থাপন করেন। তিনি শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনাবলী দেখাননি, বরং দেশভাগের কারণে সৃষ্ট গভীর মানসিক ও আত্মিক শূন্যতাকেও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এই ছায়াছবি তিনটি একত্রে ‘ট্রিলিজি’ অর্থাৎ ‘ত্রয়ী চলচ্চিত্র’ নামেও খ্যাত। ১৯৭০ সালে তাঁর তৈরি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এক অবিস্মরণীয় ও মহাকাব্যিক সৃষ্টি। এই চলচ্চিত্র সম্বন্ধে তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি –
‘‘আমি ছাড়া তিতাস হতো না। তিতাস ছিল আমার, আমার স্বপ্ন। আমার মতো মমতা নিয়ে এই কাহিনীকে কেউ তুলে ধরতে আগ্রহী হতেন না।’’
১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ঋত্বিকের শেষ ছবি – ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। এই সিনেমাটি ঋত্বিকের আত্মজীবনী মূলক চলচ্চিত্র। গল্পের নায়ক নীলকণ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন স্বয়ং ঋত্বিক। এটি আত্মজীবনীমূলক হলেও এতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আর নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সময়ের একটি নির্মোহ-নির্মম সমালোচনা। আর এই ছবিতে তাঁর বিখ্যাত উক্তি –
‘‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।’’
সিনেমা পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্য রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ‘মুসাফির’ (১৯৫৭), ‘মধুমতি’ (১৯৫৮), ‘স্বরলিপি’ (১৯৬০), ‘কুমারী মন’ (১৯৬২), ‘দ্বীপের নাম টিয়ারিং’ (১৯৬৩), ‘রাজকন্যা’ (১৯৬৫) প্রভৃতি তাঁর উৎকৃষ্ট চিত্রনাট্য। ‘দ্য লাইফ অফ দি আদিবাসীজ’, ‘ওস্তাদ’, ‘আলাউদ্দিন খান’, ‘আমার লেনিন’, ‘ফিয়ার’ ইত্যাদি শর্ট ফিল্ম ও তথ্যচিত্রগুলিও বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।
পুরস্কার ও সম্মাননা
চলচ্চিত্রে বাংলা ও বাঙালিকে আন্তর্জাতিক সীমানায় পরিচিতি করিয়ে তিনি ভূয়সী প্রশংসিত হয়েছেন। ১৯৫৭ সালে ‘মুসাফির’ চলচ্চিত্রের জন্য পঞ্চম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৫৯ সালে ‘মধুমতি’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনী কার বিভাগে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। ১৯৭০ সালে ‘হীরের প্রজাপতি’ চলচ্চিত্রের জন্য ১৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ শিশুতোষ চলচ্চিত্র পুরস্কার (প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক) লাভ করেন। এই বছরই চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৭৪ সালে ‘যুক্তিতক্কো আর গপ্পো’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এই বছরেই ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমার জন্য সেরা পরিচালক বিভাগে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন।
মূল্যায়ন
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন –
‘‘প্রত্যেক শিল্প একমাত্র সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেই সর্বাঙ্গ সুন্দর হয়। শুধুমাত্র সত্য দ্বারা শিল্প সৃষ্টি সম্ভব নয়, তবে সত্য ছাড়া শিল্প-সম্পূর্ণ হয় না।’’
কথাখানি ঋত্বিকের চলচ্চিত্রের অমোঘ সত্য। সমালোচকরা ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় অতি নাটকীয়তা ও ভারসাম্যহীনতার কথা বলে থাকেন। কিন্তু শতবর্ষ পরেও আজকের দর্শক বোদ্ধারা উপলব্ধি করেন, তিনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র প্রতিভার অধিকারী। তিনি আপামর বাঙালি তথা দেশবাসীর হৃদয়ে সত্য ও বাস্তবের দ্রষ্টা। এই মহান শিল্পী মাত্র ৫০ বছর বয়সে ১৯৭৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি পরলোক গমন করেন। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে অধ্যাপক থাকাকালীন এমন এক ঝাঁক ছাত্র তৈরি করে গেছেন, যাঁরা পরবর্তীকালে গোটা ভারতীয় সিনেমাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সিনেমা তৈরীর উদ্দেশ্য তিনি হাসতে হাসতে বলতে পারতেন –
‘‘আমি প্রতিমুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবো যে, এটা কোনো ভেবে বের করা গল্প নয়। বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। সিনেমার কাজ মন যোগানো না, মন জাগানো। ফিল্ম মানে ফুল নয়, অস্ত্র।’’

